“মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান”
রাজধানী ঢাকায় প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে অপরাধের ধরনও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন বিজ্ঞাপন, মেসেজিং অ্যাপ ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে গড়ে উঠছে নানা ধরনের প্রতারণা ও অপরাধের নেটওয়ার্ক। এর মধ্যে যৌন ব্যবসার বিজ্ঞাপন, কথিত ‘ম্যাসাজ সার্ভিস’, ‘রিয়েল সার্ভিস’, ‘এস্কর্ট সার্ভিস’ কিংবা ব্যক্তিগত সাক্ষাতের প্রলোভন দেখিয়ে গ্রাহক আকৃষ্ট করার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ফেসবুকসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আকর্ষণীয় ছবি, চটকদার ভাষা এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের নম্বর ব্যবহার করে সম্ভাব্য গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। প্রথমে সাধারণ সার্ভিসের কথা বলা হলেও কথোপকথনের একপর্যায়ে অর্থের বিনিময়ে ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ বা যৌন সম্পর্কের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এরপর নির্দিষ্ট হোটেল, আবাসিক বাসা কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তিগত স্থানে যেতে বলা হয়।
তবে এই পুরো ব্যবস্থার আরেকটি ভয়ংকর দিক হলো—সব বিজ্ঞাপন বাস্তব সেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি নয়। কিছু ক্ষেত্রে অভিযোগ রয়েছে, অনলাইনে যোগাযোগ স্থাপনের পর ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট স্থানে ডেকে নিয়ে অর্থ আদায়, গোপন ভিডিও ধারণ অথবা পরবর্তী সময়ে ব্ল্যাকমেইল করা হয়।
বাংলাদেশে ডিজিটাল মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইল, যৌন হয়রানি, সেক্সটর্শন এবং অনুমতি ছাড়া অন্তরঙ্গ ছবি বা ভিডিও প্রকাশের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা রয়েছে। ২০২৫ সালের সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের ২৫ ধারায় এসব কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপনেই শুরু ফাঁদ
অনলাইনে এ ধরনের প্রতারণার শুরু সাধারণত একটি বিজ্ঞাপন দিয়ে। বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করা হয় আকর্ষণীয় কিছু শব্দ—‘ম্যাসাজ’, ‘স্পেশাল সার্ভিস’, ‘হোম সার্ভিস’, ‘রিয়েল সার্ভিস’, ‘ফ্রেন্ডশিপ’, ‘এস্কর্ট’ কিংবা বিদেশি নামের নানা সার্ভিস।
অনেক সময় বিজ্ঞাপনে কোনো প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ ঠিকানা থাকে না। থাকে শুধু একটি মোবাইল নম্বর, মেসেঞ্জার আইডি অথবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট। আগ্রহী ব্যক্তি যোগাযোগ করলে তাকে প্রথমে ছবি পাঠানো হয়। এরপর বয়স, পেশা, অবস্থান এবং ব্যক্তিগত পছন্দ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, এ পর্যায়েই সম্ভাব্য ভুক্তভোগীর ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা হয়। কারও আর্থিক সক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা নিতে তাকে নানা প্রশ্ন করা হতে পারে। এরপর বলা হয়—নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা অগ্রিম পাঠাতে হবে অথবা কোনো হোটেল কিংবা নির্দিষ্ট বাসায় যেতে হবে।
কিছু ঘটনায় আবার প্রথমে কম টাকার কথা বলে পরে নানা অজুহাতে অতিরিক্ত টাকা দাবি করার অভিযোগ পাওয়া যায়। কেউ টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগ করা, পরিবারকে জানিয়ে দেওয়া কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে।
ম্যাসাজ সেন্টারের আড়ালে অপরাধের অভিযোগ
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় স্পা, বিউটি পার্লার ও ম্যাসাজ সেন্টারকে ঘিরে অনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ঢাকার বিভিন্ন স্পা ও ম্যাসাজ সেন্টারের একটি অংশের বিরুদ্ধে প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল ও অন্যান্য অপরাধের অভিযোগের কথা উঠে আসে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, কিছু প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন বৈধ ব্যবসার নাম ব্যবহার করে কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ রয়েছে।
অবশ্য এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—দেশের সব স্পা, ম্যাসাজ সেন্টার বা বিউটি পার্লারকে একই অভিযোগের আওতায় ফেলা যাবে না। বৈধভাবে পরিচালিত অসংখ্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যাদের সেবা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও আইনসম্মত। অপরাধের অভিযোগ থাকলে সেটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও নির্দিষ্ট ঘটনার ভিত্তিতে তদন্ত করে প্রমাণ করতে হবে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপনের ভাষা ও ছবিই অনেক সময় সম্ভাব্য গ্রাহককে আকৃষ্ট করার প্রধান হাতিয়ার। এসব বিজ্ঞাপনের কিছুতে স্বাস্থ্যসেবা বা ম্যাসাজের কথা বলা হলেও কথোপকথনের পরিধি বদলে গিয়ে ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ কিংবা যৌন সেবার প্রস্তাব আসে—এমন অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
হোটেল ও আবাসিক বাসায় যোগাযোগ
অনলাইন যোগাযোগের পর গ্রাহককে কোথায় নেওয়া হবে, সেটিও এই নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক হোটেল, ভাড়া করা ফ্ল্যাট অথবা স্বল্পমেয়াদি ভাড়া নেওয়া বাসাকে ব্যবহার করার অভিযোগ পাওয়া যায়।
২০২৩ সালে ঢাকা শহরের যৌনকর্মীদের নিয়ে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে অনলাইন যোগাযোগের মাধ্যমে দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং পরে বাড়ি বা হোটেলে যাওয়ার বর্ণনা উঠে এসেছিল। প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট একজনের বক্তব্য অনুযায়ী, অনলাইন যোগাযোগের পর নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হতো।
এ ধরনের ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো—গ্রাহক এবং সেবাদানকারী উভয়ের পরিচয় সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য থাকে না। ফলে কোনো বিরোধ দেখা দিলে কে প্রকৃত ব্যক্তি, কে মধ্যস্থতাকারী এবং কে অর্থ গ্রহণ করেছে—তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে হোটেল বা বাসায় গোপনে ক্যামেরা স্থাপন করা হলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। গোপনে ধারণ করা ভিডিও পরবর্তীতে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের কাজে ব্যবহৃত হতে পারে।
দিনে দুপুরেই ব্ল্যাকমেইল
ব্ল্যাকমেইল এখন আর শুধু রাতের অন্ধকারে সংঘটিত কোনো অপরাধ নয়। স্মার্টফোন, গোপন ক্যামেরা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং দ্রুত টাকা স্থানান্তরের ব্যবস্থা অপরাধীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
একজন ব্যক্তিকে কোনো একটি স্থানে ডেকে নেওয়ার পর তার ব্যক্তিগত মুহূর্ত গোপনে ধারণ করা হতে পারে—এমন অভিযোগ বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে এসেছে। এরপর সেই ছবি বা ভিডিও প্রকাশের ভয় দেখিয়ে টাকা দাবি করা হয়।
সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে ব্ল্যাকমেইল বলতে এমন হুমকি বা ভয় দেখানোকে বোঝানো হয়েছে, যার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তিকে গোপন তথ্য প্রকাশ বা ক্ষতির ভয় দেখিয়ে বেআইনি সুবিধা, সেবা বা কোনো কাজ করতে বাধ্য করা হয়। অপরাধের ধরন অনুযায়ী শাস্তির বিধানও রয়েছে। নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে শাস্তির মাত্রা আরও বেশি।
ফলে কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ধারণ করে তা ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া শুধু সামাজিকভাবে অনৈতিক নয়; পরিস্থিতি ও প্রমাণের ভিত্তিতে এটি ফৌজদারি অপরাধও হতে পারে।
উঠতি বয়সী তরুণদের টার্গেট
অনলাইনভিত্তিক এ ধরনের প্রতারণার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো তরুণ প্রজন্ম। নতুন পরিচয়, বন্ধুত্ব, চাকরি, মডেলিং, বিনোদন কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রলোভন দেখিয়ে তরুণ-তরুণীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা হচ্ছে—এমন ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তেও এসেছে।
২০২৪ সালে বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (CID) একটি অনলাইন চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর কথা জানায়। তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, চাকরি, মডেলিং ও ট্যালেন্ট হান্টিংয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তরুণীদের ফাঁদে ফেলা এবং পরে ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
এ ধরনের ঘটনা দেখিয়ে দেয়, অনলাইনে কোনো বিজ্ঞাপন দেখলেই সেটিকে প্রকৃত চাকরি, সেবা বা ব্যবসার বিজ্ঞাপন ধরে নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।
টাকা হাতিয়ে নেওয়ার নতুন কৌশল
অনলাইন যৌন ব্যবসার নামে প্রতারণার ক্ষেত্রে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার কৌশলও বিভিন্ন ধরনের হতে পারে।
প্রথমে অল্প অগ্রিম টাকা চাওয়া হয়। টাকা পাঠানোর পর বলা হয়—হোটেল বুকিং, নিরাপত্তা জামানত, পরিচয় যাচাই, গাড়ি ভাড়া কিংবা অন্য কোনো কারণে আরও টাকা দিতে হবে। ভুক্তভোগী টাকা পাঠাতে থাকলে দাবির পরিমাণ বাড়তে থাকে।
কেউ যখন বুঝতে পারেন তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন এবং টাকা দেওয়া বন্ধ করেন, তখন শুরু হতে পারে দ্বিতীয় ধাপের চাপ। তাকে ভয় দেখানো হতে পারে যে তার ছবি বা পরিচয় পরিবার, কর্মস্থল কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে দেওয়া হবে।
এই পর্যায়ে অর্থ আদায়ের সঙ্গে সাইবার অপরাধ যুক্ত হয়ে যায়।
বাংলাদেশে সাইবার অপরাধের মধ্যে অনলাইন হয়রানি, প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল ও ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার নিয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ বাড়ছে। ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে CID Cyber Police Centre-এর তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, এপ্রিল মাসে ৮৮৬ জন সাইবার অপরাধের ভুক্তভোগী সহায়তা চেয়েছিলেন; মার্চে এ সংখ্যা ছিল ৬৫০ এবং ফেব্রুয়ারিতে ৪৭৬।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে নজরদারির আওতায় আনার প্রশ্ন
অনলাইন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটিত হলে শুধু অপরাধীকে গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়। বিজ্ঞাপনটি কোথা থেকে দেওয়া হয়েছে, কোন অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হয়েছে, অর্থ কোথায় গেছে এবং কারা এর সঙ্গে যুক্ত—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনতে হয়।
একটি মোবাইল নম্বর বা ফেসবুক আইডি বন্ধ করে দিলে একই চক্র নতুন নামে আবার সক্রিয় হতে পারে। তাই প্রয়োজন ডিজিটাল ফরেনসিক সক্ষমতা, আর্থিক লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর সমন্বয়।
বাংলাদেশ পুলিশ ইতোমধ্যে সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় বিশেষায়িত সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। ২০২৬ সালে একটি পৃথক Cyber Police Unit গঠনের প্রস্তাবও সামনে আসে।
ভুক্তভোগীরা কেন অভিযোগ করেন না?
এ ধরনের অপরাধের বড় সমস্যা হলো সামাজিক লজ্জা ও ভয়। একজন ব্যক্তি প্রতারিত হওয়ার পরও অনেক সময় পুলিশের কাছে যেতে চান না। কারণ তিনি আশঙ্কা করেন, তার পরিবার বা কর্মস্থল বিষয়টি জানতে পারে।
অপরাধীরা এই ভয়কেই কাজে লাগায়।
বিশেষ করে কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও তাদের হাতে গেলে ভুক্তভোগী মানসিক চাপের মধ্যে পড়ে যেতে পারেন। ফলে অপরাধী টাকা দাবি করলে তিনি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে টাকা দিয়ে বিষয়টি শেষ করার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু এতে অনেক সময় চক্রটি আরও উৎসাহিত হয় এবং পরবর্তী সময়ে আরও বেশি অর্থ দাবি করে।
তাই ব্ল্যাকমেইলের ক্ষেত্রে টাকা দেওয়া বা একা অপরাধীর সঙ্গে সমঝোতা করার পরিবর্তে প্রমাণ সংরক্ষণ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
তরুণদের জন্য সতর্কবার্তা
অনলাইনে অপরিচিত কারও সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
প্রথমত, অপরিচিত কোনো ব্যক্তিকে ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও, জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি, ব্যাংক বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের তথ্য দেওয়া উচিত নয়।
দ্বিতীয়ত, অনলাইন বিজ্ঞাপনে দেওয়া কোনো নম্বর বা অ্যাকাউন্টের পরিচয় যাচাই ছাড়া অর্থ পাঠানো ঝুঁকিপূর্ণ।
তৃতীয়ত, কেউ যদি ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও প্রকাশের হুমকি দেয়, তাহলে আতঙ্কিত হয়ে সব দাবি মেনে নেওয়ার পরিবর্তে কথোপকথন, নম্বর, অ্যাকাউন্টের তথ্য ও লেনদেনের প্রমাণ সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
CID-এর Cyber Police Centre তরুণদের সাইবার অপরাধ সম্পর্কে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়ে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালিয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত একটি সচেতনতামূলক কর্মসূচিতেও তরুণদের অনলাইনে সতর্ক থাকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর করণীয়
অনলাইন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে যৌন ব্যবসা, প্রতারণা বা ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
প্রথমত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত নজরদারি ও আইনবহির্ভূত বিজ্ঞাপন শনাক্ত করা।
দ্বিতীয়ত, একই মোবাইল নম্বর, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস অ্যাকাউন্ট, IP তথ্য বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে একাধিক অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে কি না, তা বিশ্লেষণ করা।
তৃতীয়ত, কোনো হোটেল, বাসা বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত করা। একই সঙ্গে বৈধ ব্যবসা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান যাতে অযথা হয়রানির শিকার না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
চতুর্থত, নারী ও তরুণ ভুক্তভোগীদের পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করা।
অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা
অনলাইনে যৌন সেবা বা সম্পর্কের নামে পরিচালিত সব বিজ্ঞাপনকে একই ধরনের অপরাধ হিসেবে দেখা যেমন ঠিক নয়, তেমনি কোনো বিজ্ঞাপনকে নিরীহ ধরে নেওয়াও নিরাপদ নয়। বিজ্ঞাপনের আড়ালে প্রতারণা, মানবপাচার, জোরপূর্বক যৌন শোষণ কিংবা ব্ল্যাকমেইল আছে কি না—তা নির্ভর করবে তদন্ত ও প্রমাণের ওপর।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানুষকে সচেতন করা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বিজ্ঞাপন, একটি ফোন নম্বর কিংবা একটি আকর্ষণীয় ছবি কখনোই কোনো ব্যক্তির পরিচয় বা উদ্দেশ্যের নিশ্চয়তা দেয় না।
অপরাধীরা প্রযুক্তি ব্যবহার করছে—আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও তাই প্রযুক্তি ব্যবহার করেই তাদের শনাক্ত করতে হবে।
শেষ কথা
ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবনে অনলাইন এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ব্যবসা, শিক্ষা, চাকরি, বিনোদন, বন্ধুত্ব—সবকিছুর মতো অপরাধের ক্ষেত্রেও ডিজিটাল মাধ্যমের ব্যবহার বাড়ছে।
অনলাইনে ম্যাসাজ বা অন্য কোনো সার্ভিসের বিজ্ঞাপন দেখেই সেটিকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না। কিন্তু একই বিজ্ঞাপনের আড়ালে যদি প্রতারণা, যৌন শোষণ, মানবপাচার, গোপনে ভিডিও ধারণ, ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় বা সাইবার ব্ল্যাকমেইলের ঘটনা থাকে, তাহলে সেটি অবশ্যই তদন্তের দাবি রাখে।
বিশেষ করে উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণীদের লক্ষ্য করে পরিচালিত অনলাইন ফাঁদ বন্ধ করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কর্তৃপক্ষ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী—সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
কারণ একটি ভুল ক্লিক, একটি অপরিচিত নম্বরে ফোন, কিংবা মুহূর্তের অসতর্কতায় পাঠানো একটি ব্যক্তিগত ছবি কখনো কখনো একজন মানুষের সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
অন্যদিকে যারা ব্ল্যাকমেইলের শিকার হচ্ছেন, তাদের মনে রাখা জরুরি—ভয় পেয়ে নীরব থাকা অপরাধীদের শক্তিশালী করে। আইনগত সহায়তা নেওয়া, প্রমাণ সংরক্ষণ করা এবং দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোই হতে পারে সেই চক্রের বিরুদ্ধে প্রথম কার্যকর পদক্ষেপ।
ঢাকা মহানগর পুলিশের ওয়েবসাইটে চাঁদাবাজি ও অর্থ আদায়ের অভিযোগের জন্য হেল্পলাইন নম্বরও প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করার জন্য; প্রতারণা, শোষণ ও ব্ল্যাকমেইলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের জন্য নয়। অনলাইন অপরাধের নতুন এই বাস্তবতায় তাই প্রয়োজন আরও সচেতনতা, দ্রুত তদন্ত এবং ভুক্তভোগীবান্ধব আইনগত ব্যবস্থা।

Reporter Name 














