চৌগাছা (যশোর) প্রতিনিধি:
যশোরের চৌগাছা উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সরকারি সারের ডিলারশিপ পেতে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জনাব তরিকুল ইসলাম ডাবলুর বিরুদ্ধে জাল-জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নারায়ণপুর ইউনিয়নের সারের ডিলারশিপের চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পেয়েছে ‘মেসার্স আমেনা ট্রেডার্স’। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মোছাঃ আমেনা বেগম, যিনি নারায়ণপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জনাব তরিকুল ইসলাম ডাবলুর স্ত্রী।
সরকারি নীতিমালার (সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০২৫ [সংশোধিত]) স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে—ডিলারশিপ পাওয়ার অন্যতম পূর্বশর্ত হলো আবেদনকারীর নিজস্ব বা ভাড়াকৃত অন্তত ৫০ মেট্রিক টন সার ধারণক্ষমতা সম্পন্ন গুদাম থাকতে হবে। অভিযোগ রয়েছে, এই শর্ত পূরণে জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন তরিকুল ইসলাম ডাবলু তার স্ত্রীর পক্ষে।
প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ের সময় মোছাঃ আমেনা বেগম যে গুদামটি দেখিয়েছিলেন, সেটি মূলত ‘এনজিও’-র কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গুদামটির প্রকৃত মালিক জনাব জহুরুল। উপজেলা থেকে পরিদর্শনে যাওয়া উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জনাব সাঈদকে জহুরুল জানিয়েছিলেন, “এটি একটি এনজিও অফিস। সরকারি চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আয়তনের তিন ভাগের এক ভাগও এটি নয়। জনাব ডাবলু আমাকে চাপ দিয়ে জোরপূর্বক এটি দেখাচ্ছেন। বিষয়টি আপনারা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানান।” তখন কর্মকর্তা সাঈদ আশ্বাস দিয়ে বলেন, পরিদর্শনের নিয়ম রক্ষায় তারা এসেছেন এবং এই গুদামের ভিত্তিতে ডিলারশিপ পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
পরবর্তীতে গুদাম মালিক জহুরুলের অপরাগতা সত্ত্বেও ডাবলু তার স্ত্রীর নামে ভাড়ার চুক্তিনামা করে দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। জহুরুল রাজি না হওয়ায় ডাবলু ও আমেনা বেগম জহুরুলের স্বাক্ষর নকল করে একটি ভুয়া ভাড়ার চুক্তিনামা তৈরি করেন এবং তা কৃষি মন্ত্রণালয়ে জমা দেন।
এ বিষয়ে গুদাম মালিক জনাব জহুরুল আক্ষেপ করে বলেন, “তরিকুল ইসলাম ডাবলু এর আগেও আমার স্বাক্ষর জাল করে একটি মামলায় আমাকে সাক্ষী বানিয়েছিল। এবারও গুদাম ভাড়ার চুক্তিনামায় আমার স্বাক্ষর জাল করে সরকারের কাছে জমা দিয়েছে। আমি এখন আতঙ্কে আছি, কখন সে আমার স্বাক্ষর জাল করে সমস্ত সম্পত্তি লিখে নেয়! সে পারে না—এমন কোনো কাজ নেই। সরকারি লোকজন যখন পরিদর্শন করতে আসে, তখনই আমি অফিসার সাঈদ সাহেবকে সব বলেছিলাম। কিন্তু তারপর কীভাবে কী হলো, আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না।”
বিষয়টি নিয়ে চৌগাছা উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জনাব সাঈদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ইঙ্গিতে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করলেও চূড়ান্ত দায়ভার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার ওপর চাপিয়ে দেন।
এই ডিলারশিপ প্রদান নিয়ে আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, যাচাই-বাছাইয়ের চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্ত মোছাঃ আমেনা বেগম সরকারের অনুকূলে প্রয়োজনীয় পে-অর্ডার বা চেক জমা দিতে ব্যর্থ হন। উপজেলা যাচাই-বাছাই কমিটির ফাইনাল চেকলিস্টে হাতে লেখা রয়েছে “চেক নাই”। (যার একটি কপি এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে)। ডিলারশিপ তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও কেন চেক জমা পড়েনি—তা নিয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের মধ্যে তুমুল বাকবিতণ্ডা হয়। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য চৌগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার সাথে মুঠোফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
নারায়ণপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি তরিকুল ইসলাম ডাবলুর অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কিছুদিন আগে ইউনিয়নের শফি গাজী নামের এক ব্যক্তির একটি ঝামেলা মিটিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি ৩০,০০০ টাকা নেন। কিন্তু ঝামেলা মেটানো তো দূরের কথা, উল্টো বিষয়টি সমাধান করতে শফি গাজীকে আরও ২ লক্ষ টাকা গুনতে হয় এবং ডাবলু আজ পর্যন্ত সেই ৩০,০০০ টাকা ফেরত দেননি।
তাছাড়া, ইউনিয়নের বাহেখানপুর গ্রামের শফিয়ার নামের এক ব্যক্তির স্ত্রী লালবানুর উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ১৫ শতক জমি জালিয়াতির মাধ্যমে আমিরুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। ক্রেতা আমিরুল ইসলাম জানান, “আমি ৩ লক্ষ টাকার বিনিময়ে তরিকুল ইসলাম ডাবলু ও মিজানের মাধ্যমে এই জমি কিনেছি।” পৈতৃক জমি হারিয়ে লালবানু এখন মৃত্যুশয্যায়। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী শফিয়ার বলেন, “ডাবলু ও মিজানের কাছ থেকে আমিরুল কীভাবে এই জমি কিনলো, তা আমরা বুঝে উঠতে পারছি না।” (এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও প্রমাণ হিসেবে আমাদের হাতে এসেছে)।
ডাবলুর ক্ষমতার দাপট থেকে রক্ষা পাননি স্থানীয় চাঁদপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জনাব শফিকুল ইসলামও। সম্প্রতি বিদ্যালয় থেকে ৩টি সাইকেল চুরি হয়। অভিযোগে ও প্রাথমিক প্রমাণে নাম আসে ডাবলুর ছেলে, যে ওই স্কুলের ১০ম শ্রেণীর ছাত্র। পরবর্তীতে বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির নির্দেশনায় প্রধান শিক্ষক বিষয়টি সমাধানের লক্ষ্যে তরিকুল ইসলাম ডাবলুর নিকট একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি ইস্যু করেন। চিঠি ইস্যু করার অপরাধে ১০-১৫ জন সশস্ত্র লোক নিয়ে বিদ্যালয়ে হাজির হন ডাবলু। প্রধান শিক্ষকের কার্যালয় থেকে তাকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে আনা হয় এবং সহকর্মী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সামনে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়।
ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে প্রধান শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যালয়টির এক শিক্ষক বলেন, “টিচার্স রুমে ঢুকে হেড স্যারের সাথে সেদিন যে আচরণ করা হয়েছে, তা মেনে নেওয়া যায় না। কিন্তু উনি স্থানীয় বিএনপি সভাপতি হওয়ায় আমরা নিরুপায়।”
এসব অভিযোগের বিষয়ে তরিকুল ইসলাম ডাবলুর সাথে সরাসরি যোগাযোগ করা হলে তিনি অন্যান্য অভিযোগ এড়িয়ে গেলেও, স্কুল থেকে সাইকেল চুরি এবং সারের ডিলারশিপের জন্য গুদাম ভাড়ার চুক্তিনামায় জাল স্বাক্ষরের বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

Reporter Name 














