(বিশেষ প্রতিবেদক )
বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স (FSCD)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গড়ে ৭৩ থেকে ৭৫টি ছোট-বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে থাকে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটায় জনমনে নতুন করে নিরাপত্তা ও সচেতনতার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।গত ৩ দিনে দেশে ৩টি বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে:১৬ অক্টোবর ২০২৬: ঢাকার চকবাজারের ছোট কাটরা এলাকার মানসুর খান প্লাজার ষষ্ঠতলায় একটি দোকানে ভয়াবহ আগুন লাগে। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট কাজ করে। ১৩ অক্টোবর ২০২৬: এর আগেও ১৩ অক্টোবর চকবাজারে আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসকে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়, যেখানে ধোঁয়ায় তাদের ৪ জন কর্মী অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৪ অক্টোবর ২০২৬: গাজীপুরের একটি ওষুধ কারখানার চতুর্থ তলায় ভয়াবহ আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ২০টি ইউনিট এবং পরবর্তীতে সেনাবাহিনীর সহায়তায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। এই ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।এর বাইরে ঢাকার খিলগাঁও এলাকায় গ্যারেজ ও সমিলসহ বেশ কয়েকটি দোকানে লাগা আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ২০টি ইউনিট প্রায় ২ ঘণ্টা কাজ করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালে দেশে মোট অগ্নিকাণ্ডর ঘটনা ঘটে ২৭,০৫৯টি যেখানে ৮৫ জন নিহত এবং ২৬৭ জন আহত হয়,আর্থিক ক্ষতি প্রায় ৫৬৯.৯৭ কোটি টাকা (যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ২৭.৭% বেশি)। ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে, দেশে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডের বড় একটি অংশের পেছনে মূলত নিচের ৩টি কারণ দায়ী থাকে . বৈদ্যুতিক গোলযোগ বা শর্ট সার্কিট. জ্বলন্ত বিড়ি-সিগারেটের টুকরো এবং ত্রুটিপূর্ণ চুলা ও গ্যাস সিলিন্ডার বা লাইন লিকেজ।২০২৬ সালের এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান পাওয়া না গেলেও, গত ছয় মাসের সংবাদ পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে এই বছর অগ্নিকাণ্ডের হার অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেকটাই কম। এই সাফল্যের পেছনে বিশেষজ্ঞরা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স (FSCD)-এর বিভিন্ন শিক্ষামূলক কার্যক্রমকে কৃতিত্ব দিচ্ছেন।বিশেষ করে বর্তমান মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ, (এসইউপি)-এর বিভিন্ন উদ্যোগ, সভা ও সেমিনারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে আগুন লাগার বিভিন্ন কারণ এবং তা এড়ানোর উপায় সম্পর্কে নিয়মিত সতর্ক ও সজাগ করে তোলা হচ্ছে। তিনি লাগাতারভাবে বিভিন্ন জেলা এবং ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সভা-সেমিনার করে চলেছেন। ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তা জানান, মহাপরিচালক দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রতিটি ইউনিট আগের তুলনায় অনেক বেশি সজাগ রয়েছে এবং সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথেই দ্রুত অ্যাকশনে যাচ্ছে। তিনি আরো বলেন অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও ফায়ার সার্ভিস কিছু বাস্তবমুখী সমস্যার সম্মুখীন হয় । ঢাকা শহরের কিছু এলাকায় প্রচুর সংকীর্ণ রাস্তার কারণে গাড়ি নিয়ে পৌঁছাতে বেগ পেতে হয়।অনেক জায়গায় পানির উৎস খুঁজে পেতে দেরি হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফায়ার সার্ভিসকে আরও উন্নত, আধুনিক এবং শক্তিশালী করতে নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি যার মধ্য সংকীর্ণ গলি বা বহুতল ভবনের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে আগুন নেভানো বা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য রিমোট-কন্ট্রোলড ফায়ারফাইটিং রোবট ও থার্মাল ইমেজিং ড্রোন ব্যবহার করা। কেমিক্যাল বা শিল্পকারখানার আগুন এবং বহুতল ভবনের দুর্যোগ মোকাবেলায় কেমিক্যাল টেন্ডার ও উন্নত টার্নটেবিল ল্যাডার (TTL)-এর সংখ্যা বাড়ানো। আইন অমান্যকারী ভবনের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক জরিমানা বা ভবন সিলগালা করার মতো সীমিত ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা ফায়ার সার্ভিসকে প্রদান করা।
রাজউক, সিটি কর্পোরেশন ও ফায়ার সার্ভিসের সমন্বয়ে বহুতল ও বাণিজ্যিক ভবনে ফায়ার সেফটি প্ল্যান এবং জরুরি বহির্গমন পথ নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক করা।পুরান ঢাকা বা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পানির সংকট ও সরু রাস্তার সমস্যা সমাধানে ভূগর্ভস্থ ফায়ার হাইড্রেন্ট নেটওয়ার্ক এবং ওয়াটার রিজার্ভার স্থাপন করা। দেশের প্রতিটি উপজেলা এবং শিল্পাঞ্চলে অন্তত একটি করে ফায়ার স্টেশন নিশ্চিত করা।বহুতল ভবন, কেমিক্যাল দুর্ঘটনা এবং ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগের জন্য পৃথক বিশেষায়িত রেসকিউ টিম তৈরি এবং ফায়ার ফাইটারদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।প্রতিটি ওয়ার্ড বা এলাকায় প্রশিক্ষিত ভলান্টিয়ার টিম তৈরি করা এবং স্কুল, কলেজ, পোশাক কারখানা ও বাণিজ্যিক ভবনে নিয়মিত অগ্নিনির্বাপণ মহড়া (Fire Drill) বাধ্যতামূলক করা।

Reporter Name 















