Dhaka , Monday, 26 October 2026
সর্বশেষ
ডিলার নিয়োগে চরম দলীয়করণ ও দুর্নীতির অভিযোগে যশোরে বিরোধী দলের ৫ এমপির সংবাদ সম্মেলন ডহুরী-কাকবাধালে রশি টানা খেলায় উৎসাহ দিলেন চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী রফিকুল ইসলাম, খেলোয়াড়দের দিলেন টি-শার্ট চৌগাছায় সারের ডিলারশিপ পেতে জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতির বিরুদ্ধে খুলনায় পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামে ইমামদের প্রশিক্ষণ ভাতা কম দেওয়ার অভিযোগ, প্রতি ব্যাচে এক লাখ টাকা করে আত্মসাৎ* রাজপথের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করা ত্যাগের রাজনীতি: সব যোগ্যতা পেরিয়ে ডিলারশিপ পেয়েও অপপ্রচারের মুখে প্রবীণ বিএনপি নেতার পরিবার গাজীপুরে কারখানা কর্মকর্তার ধমকের পর ফ্লোরে ঢলে পড়ে নারী পোশাকশ্রমিকের মৃত্যু: ছুটি না দেওয়া ও অবহেলার অভিযোগ যশোরে ঘর থেকে বৃদ্ধার গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার লালনের দর্শন মানবতা, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার অনন্য দৃষ্টান্ত: সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী উপজেলা বিএনপির শীর্ষ দুই পদে প্রধান শিক্ষক বললেন, ‘আমরা সরকারি চাকরি ছেড়ে দেবো’

বিআরটিসিতে সিন্ডিকেটের দাপট : মফিজ-কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ১৫ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ

  • Reporter Name
  • Update Time : 11:58 pm, Wednesday, 16 September 2026
  • 151 Time View

 

মেরিনা রওশন তৃপ্তি, বিশেষ প্রতিবেদক ::–

ঢাকাঃ রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) সাধারণ মানুষের সাশ্রয়ী ও নিরাপদ যাতায়াতের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। কিন্তু গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি যেন এক শক্তিশালী সিন্ডিকেটের লুটপাটের ময়দানে পরিণত হয়েছে।

চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দায়ের হওয়া এক অভিযোগে এই সব অনিয়ম দূর্নীতির তথ্য উঠে এসেছে এবং বিআরটিসির অভ্যন্তরীণ তথ্য সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। জুলাই ২০২২ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত মাত্র তিন বছরে শুধু এই ডিপোতেই ১৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকারও বেশি অপচয়, ক্ষতি ও চুরির অভিযোগ উঠেছে।

ভুয়া বিল, জ্বালানি ও ফেরি খরচ ফাঁকি, অগ্রিম ভাতা, টিএ/ডিএ আত্মসাৎ এবং হিসাব জালিয়াতির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদ যেভাবে গিলে খাওয়া হয়েছে, তা প্রতিষ্ঠানটির গভীরে প্রোথিত সিন্ডিকেটের চিত্রই তুলে ধরে।

দুদকে দায়ের করা অভিযোগে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর রাজস্ব আদায়, জ্বালানি, বায়ু, জমা-রাজস্ব খাতে এবং নির্ধারিত ব্যয় নির্বাহের নামে অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।

অভিযোগকারী বিআরটিসির কেন্দ্রীয় স্টোর অফিসার মো. মোস্তাকিজুর রহমানের দাবি, জ্বালানি, গ্যারেজ, টুলস ও ফেরিসহ বিভিন্ন খাতে এবং প্রথম মাইলেজ ভাতা, দৈনিক ভাতা ও বিবিধ ব্যয়ের নামে ক্যাশিয়ারের মাধ্যমে নগদ উত্তোলন করে প্রায় ১০-১২ কোটি টাকার অপচয়, ক্ষতি ও চুরি ঘটনা ঘটেছে।

তদন্ত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে এই সময়কালের ৪৩০ পাতারও বেশি তথ্য সংযুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।

অভিযোগে চিহ্নিত প্রধান ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন মো. মফিজ উদ্দিন। তিনি জুলাই ২০২২ থেকে আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর ইউনিট প্রধান (ম্যানেজার অপারেশন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি জোয়ারসাহারা বাস ডিপোর ইউনিট প্রধানের পদ থেকে বদলি হয়ে প্রধান কার্যালয়ে অপারেশন ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

দ্বিতীয় অভিযুক্ত মো. কামরুজ্জামান, যিনি সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত সিনিয়র ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে একই ডিপোতে ছিলেন এবং এখন তিনি খুলনা বাস ডিপোর দ্বায়িত্বে রয়েছেন।

ওই অভিযোগে আরও নাম উঠেছে দায়িত্বপ্রাপ্ত ক্যাশিয়ার মো. আ. করিম এবং হিসাব কর্মকর্তা মো. রমজান হোসেনের। এদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা ও দুদকের তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী।

বিআরটিসির অভ্যন্তরে এই দুই কর্মকর্তাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ছত্রছায়ার অভিযোগ উঠে আসছিল। মো. মফিজ উদ্দিনকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একাংশ বলছেন, তিনি অতীতে চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপো, কুমিল্লা, বরিশালের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।

অভিযোগকারীদের দাবি, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি চট্টগ্রামের তৎকালীন এমপি ও মন্ত্রী নওফেলের আত্মীয় হিসেবে পরিচয় দিতেন এবং সেই পরিচয়েই লাভজনক ডিপোগুলোর দায়িত্ব পেয়েছিলেন।

একইভাবে মো. কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে, তার শ্বশুরবাড়ি কুমিল্লায় হওয়ায় তিনি সাবেক এমপি শেখ সেলিমের শ্বশুরবাড়ির আত্মীয় হিসেবে পরিচয় দিতেন এবং সেই ছত্রছায়ায় বড় বড় ডিপোতে পোস্টিং পেয়েছিলেন।

সম্প্রতি তাকে খুলনা বাস ডিপোর দায়িত্ব দেওয়াকে কেন্দ্র করেও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। কর্মকর্তাদের একাংশ নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ ডিপো ও ইউনিটে পদায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে।

এসব অভিযোগের পক্ষে তদন্ত প্রতিবেদন এখনও প্রকাশিত না হলেও, বিআরটিসির অভ্যন্তরীণ তথ্য ও দুদকে জমা দেওয়া নথিপত্রে চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর আর্থিক অনিয়মের চিত্র স্পষ্ট।

জ্বালানি তেল ও ফেরি বিল, গ্যারেজ শ্রমিকের মজুরি, মাইলেজ বিল, দৈনিক ভাতা এবং টিএ/ডিএর নামে ক্যাশিয়ারের মাধ্যমে নগদ উত্তোলন করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে। একই সময়ে ডিপোর রাজস্ব আদায়েও ঘাটতি দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

বিআরটিসির বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা সম্প্রতি ওই সিন্ডিকেট প্রসঙ্গে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, বিআরটিসিতে ফ্যাসিস্ট সরকারের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছে। তারা নানান অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। খুব শীঘ্রই তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চেয়ারম্যানের ওই বক্তব্যে প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে চলা লুটপাটের স্বীকৃতি হিসেবেই দেখা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ আমলে গড়ে ওঠা ওই সিন্ডিকেট যে ক্ষমতার পালাবদলের পরও টিকে আছে, তা চেয়ারম্যানের কথাতেই স্পষ্ট। অনেক ডিপোতে এখনও সেই সময়ের লিজ ও কাউন্টার ব্যবস্থাপনা বহাল রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান দীর্ঘদিন ধরে পরিবহন খাতের দুর্নীতি নিয়ে সতর্ক করে আসছেন।

তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতা ও মেধাকে উপেক্ষা করে স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ পদে লোক বসানো গুরুতর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির শামিল। এ ধরনের সিন্ডিকেট ভিত্তিক নিয়োগ কেবল প্রশাসনিক শৃঙ্খলাই ভেঙে দেয় না, জনস্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতার ওপর জনগণের আস্থাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

টিআইবির এক গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবহন খাতে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও সিন্ডিকেটই অনিয়ম ও দুর্নীতির মূল কারণ। প্রাইভেট বাস খাতে বছরে অন্তত এক হাজার কোটি টাকারও বেশি চাঁদা ও ঘুষ আদায় হয়, যার বড় অংশ রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহল ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পকেটে যায়।

বিআরটিএ ইতোমধ্যে দুর্নীতির তালিকায় শীর্ষে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম। অন্যদিকে বিআরটিসির মতো রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় একই ধরনের রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও হিসাব জালিয়াতি চললে জনগণের আস্থা আরও ক্ষুণ্ন হবে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

অর্থনীতিবিদ ও সুশাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিআরটিসির মতো প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় রোধ করা সম্ভব নয়।

একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, যখন কোনো কর্মকর্তা রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে যদি লাভজনক পদে বহাল থাকেন এবং হিসাবের জালিয়াতি চলে, তখন তা ব্যক্তিগত দুর্নীতির পর্যায় পেরিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সংকট তৈরি করে। দুদক ও বিভাগীয় তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া একান্ত জরুরি।

আরেকজন বিশ্লেষকের মতে, ক্ষমতার পালাবদলের পরও পুরনো সিন্ডিকেট যদি বহাল থাকে, তাহলে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি অর্থহীন হয়ে পড়ে।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত মো. মফিজ উদ্দিন ও মো. কামরুজ্জামানের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার ফোন করা হয়। কিন্তু তারা ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া সম্ভব হয়নি।

বিআরটিসির চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর এই অভিযোগ কেবল কয়েকজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অনিয়মের চিত্র নয়। এটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক ছত্রছায়া, হিসাব জালিয়াতি এবং সিন্ডিকেট ভিত্তিক লুটপাটের একটি বড় চিত্র।

চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লার বক্তব্য, দুদকে দায়ের করা অভিযোগ এবং টিআইবিসহ বিশেষজ্ঞদের সতর্ক বার্তা মিলে একই সত্যকেই তুলে ধরছে। বিআরটিসিকে গিলে খাওয়া সিন্ডিকেট এখনও সক্রিয়।

দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত ছাড়া এই প্রতিষ্ঠানকে জনগণের সেবায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় এখনই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার এখন সময় এসেছে।

Tag :
About Author Information

Popular Post

ডিলার নিয়োগে চরম দলীয়করণ ও দুর্নীতির অভিযোগে যশোরে বিরোধী দলের ৫ এমপির সংবাদ সম্মেলন

বিআরটিসিতে সিন্ডিকেটের দাপট : মফিজ-কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ১৫ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ

Update Time : 11:58 pm, Wednesday, 16 September 2026

 

মেরিনা রওশন তৃপ্তি, বিশেষ প্রতিবেদক ::–

ঢাকাঃ রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) সাধারণ মানুষের সাশ্রয়ী ও নিরাপদ যাতায়াতের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। কিন্তু গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি যেন এক শক্তিশালী সিন্ডিকেটের লুটপাটের ময়দানে পরিণত হয়েছে।

চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দায়ের হওয়া এক অভিযোগে এই সব অনিয়ম দূর্নীতির তথ্য উঠে এসেছে এবং বিআরটিসির অভ্যন্তরীণ তথ্য সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। জুলাই ২০২২ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত মাত্র তিন বছরে শুধু এই ডিপোতেই ১৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকারও বেশি অপচয়, ক্ষতি ও চুরির অভিযোগ উঠেছে।

ভুয়া বিল, জ্বালানি ও ফেরি খরচ ফাঁকি, অগ্রিম ভাতা, টিএ/ডিএ আত্মসাৎ এবং হিসাব জালিয়াতির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদ যেভাবে গিলে খাওয়া হয়েছে, তা প্রতিষ্ঠানটির গভীরে প্রোথিত সিন্ডিকেটের চিত্রই তুলে ধরে।

দুদকে দায়ের করা অভিযোগে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর রাজস্ব আদায়, জ্বালানি, বায়ু, জমা-রাজস্ব খাতে এবং নির্ধারিত ব্যয় নির্বাহের নামে অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।

অভিযোগকারী বিআরটিসির কেন্দ্রীয় স্টোর অফিসার মো. মোস্তাকিজুর রহমানের দাবি, জ্বালানি, গ্যারেজ, টুলস ও ফেরিসহ বিভিন্ন খাতে এবং প্রথম মাইলেজ ভাতা, দৈনিক ভাতা ও বিবিধ ব্যয়ের নামে ক্যাশিয়ারের মাধ্যমে নগদ উত্তোলন করে প্রায় ১০-১২ কোটি টাকার অপচয়, ক্ষতি ও চুরি ঘটনা ঘটেছে।

তদন্ত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে এই সময়কালের ৪৩০ পাতারও বেশি তথ্য সংযুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।

অভিযোগে চিহ্নিত প্রধান ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন মো. মফিজ উদ্দিন। তিনি জুলাই ২০২২ থেকে আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর ইউনিট প্রধান (ম্যানেজার অপারেশন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি জোয়ারসাহারা বাস ডিপোর ইউনিট প্রধানের পদ থেকে বদলি হয়ে প্রধান কার্যালয়ে অপারেশন ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

দ্বিতীয় অভিযুক্ত মো. কামরুজ্জামান, যিনি সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত সিনিয়র ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে একই ডিপোতে ছিলেন এবং এখন তিনি খুলনা বাস ডিপোর দ্বায়িত্বে রয়েছেন।

ওই অভিযোগে আরও নাম উঠেছে দায়িত্বপ্রাপ্ত ক্যাশিয়ার মো. আ. করিম এবং হিসাব কর্মকর্তা মো. রমজান হোসেনের। এদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা ও দুদকের তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী।

বিআরটিসির অভ্যন্তরে এই দুই কর্মকর্তাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ছত্রছায়ার অভিযোগ উঠে আসছিল। মো. মফিজ উদ্দিনকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একাংশ বলছেন, তিনি অতীতে চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপো, কুমিল্লা, বরিশালের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।

অভিযোগকারীদের দাবি, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি চট্টগ্রামের তৎকালীন এমপি ও মন্ত্রী নওফেলের আত্মীয় হিসেবে পরিচয় দিতেন এবং সেই পরিচয়েই লাভজনক ডিপোগুলোর দায়িত্ব পেয়েছিলেন।

একইভাবে মো. কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে, তার শ্বশুরবাড়ি কুমিল্লায় হওয়ায় তিনি সাবেক এমপি শেখ সেলিমের শ্বশুরবাড়ির আত্মীয় হিসেবে পরিচয় দিতেন এবং সেই ছত্রছায়ায় বড় বড় ডিপোতে পোস্টিং পেয়েছিলেন।

সম্প্রতি তাকে খুলনা বাস ডিপোর দায়িত্ব দেওয়াকে কেন্দ্র করেও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। কর্মকর্তাদের একাংশ নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ ডিপো ও ইউনিটে পদায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে।

এসব অভিযোগের পক্ষে তদন্ত প্রতিবেদন এখনও প্রকাশিত না হলেও, বিআরটিসির অভ্যন্তরীণ তথ্য ও দুদকে জমা দেওয়া নথিপত্রে চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর আর্থিক অনিয়মের চিত্র স্পষ্ট।

জ্বালানি তেল ও ফেরি বিল, গ্যারেজ শ্রমিকের মজুরি, মাইলেজ বিল, দৈনিক ভাতা এবং টিএ/ডিএর নামে ক্যাশিয়ারের মাধ্যমে নগদ উত্তোলন করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে। একই সময়ে ডিপোর রাজস্ব আদায়েও ঘাটতি দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

বিআরটিসির বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা সম্প্রতি ওই সিন্ডিকেট প্রসঙ্গে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, বিআরটিসিতে ফ্যাসিস্ট সরকারের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছে। তারা নানান অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। খুব শীঘ্রই তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চেয়ারম্যানের ওই বক্তব্যে প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে চলা লুটপাটের স্বীকৃতি হিসেবেই দেখা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ আমলে গড়ে ওঠা ওই সিন্ডিকেট যে ক্ষমতার পালাবদলের পরও টিকে আছে, তা চেয়ারম্যানের কথাতেই স্পষ্ট। অনেক ডিপোতে এখনও সেই সময়ের লিজ ও কাউন্টার ব্যবস্থাপনা বহাল রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান দীর্ঘদিন ধরে পরিবহন খাতের দুর্নীতি নিয়ে সতর্ক করে আসছেন।

তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতা ও মেধাকে উপেক্ষা করে স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ পদে লোক বসানো গুরুতর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির শামিল। এ ধরনের সিন্ডিকেট ভিত্তিক নিয়োগ কেবল প্রশাসনিক শৃঙ্খলাই ভেঙে দেয় না, জনস্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতার ওপর জনগণের আস্থাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

টিআইবির এক গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবহন খাতে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও সিন্ডিকেটই অনিয়ম ও দুর্নীতির মূল কারণ। প্রাইভেট বাস খাতে বছরে অন্তত এক হাজার কোটি টাকারও বেশি চাঁদা ও ঘুষ আদায় হয়, যার বড় অংশ রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহল ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পকেটে যায়।

বিআরটিএ ইতোমধ্যে দুর্নীতির তালিকায় শীর্ষে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম। অন্যদিকে বিআরটিসির মতো রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় একই ধরনের রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও হিসাব জালিয়াতি চললে জনগণের আস্থা আরও ক্ষুণ্ন হবে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

অর্থনীতিবিদ ও সুশাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিআরটিসির মতো প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় রোধ করা সম্ভব নয়।

একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, যখন কোনো কর্মকর্তা রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে যদি লাভজনক পদে বহাল থাকেন এবং হিসাবের জালিয়াতি চলে, তখন তা ব্যক্তিগত দুর্নীতির পর্যায় পেরিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সংকট তৈরি করে। দুদক ও বিভাগীয় তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া একান্ত জরুরি।

আরেকজন বিশ্লেষকের মতে, ক্ষমতার পালাবদলের পরও পুরনো সিন্ডিকেট যদি বহাল থাকে, তাহলে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি অর্থহীন হয়ে পড়ে।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত মো. মফিজ উদ্দিন ও মো. কামরুজ্জামানের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার ফোন করা হয়। কিন্তু তারা ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া সম্ভব হয়নি।

বিআরটিসির চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর এই অভিযোগ কেবল কয়েকজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অনিয়মের চিত্র নয়। এটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক ছত্রছায়া, হিসাব জালিয়াতি এবং সিন্ডিকেট ভিত্তিক লুটপাটের একটি বড় চিত্র।

চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লার বক্তব্য, দুদকে দায়ের করা অভিযোগ এবং টিআইবিসহ বিশেষজ্ঞদের সতর্ক বার্তা মিলে একই সত্যকেই তুলে ধরছে। বিআরটিসিকে গিলে খাওয়া সিন্ডিকেট এখনও সক্রিয়।

দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত ছাড়া এই প্রতিষ্ঠানকে জনগণের সেবায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় এখনই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার এখন সময় এসেছে।